এহিয়া আহমদ :: রাত পেরোলেই মুসলিম উম্মাহের পবিত্র দিন ঈদুল ফিতর। দীর্ঘএক মাস সিয়াম সাধনার পর আসছে পবিত্র এই দিন। ঈদে নতুন কাপড়ের ঘ্রাণ নিতে এবং ঈদুল ফিতর ভাগাভাগি করতে ঈদের পোশাক, জুতা, কসমেটিকস ও গহণাসামগ্রী কেনাকাটার জন্য মানুষজনের দৌড়ঝাঁপ চলছে রাত-দিন। এজন্য ক্রেতারা সাধারণ মার্কেট ও বিপণিবিতান কিংবা অভিজাত শপিংমলগুলোয় ভিড় জমাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
গোটা দেশের বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলোতে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে শেষ সময়ে নিজেদের আকর্ষণীয় করে তুলতে তরুণ-তরুণীরা উভয়েই রূপচর্চার প্রতি বাড়তি নজর দিচ্ছেন। এজন্য সিলেট নগরীসহ জেলার প্রত্যেকটি বাজারে বইছে ঈদের আবহ। তরুণ-তরুণীরা কেনাকাটার পাশাপাশি এখন ছুটছেন সেলুন ও বিউটি পার্লারগুলোতে।
মুসলিম উম্মাহের পবিত্র মাস মাহে রামাদ্বানের শেষ পর্যায়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়েছে নগরীর সেলুনগুলোতে। খুর-কাচির খচখচ শব্দের সাথে দিন-রাত কাজ করছেন নরসুন্দররা।
নগরীর বিভিন্ন সেলুন ঘুরে গিয়ে দেখা যায়, ঈদকে সামনে রেখে সেলুনগুলোতে রয়েছে বাড়তি প্রস্তুতি। রমজানের আগেই সংগ্রহে রাখা হয়েছে সেবার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। সেবা প্রদানের সময়ও বাড়িয়েছে নামিদামি সেলুনগুলো। সকালে নির্ধারিত সময়ের আগেই খুলে বন্ধ হচ্ছে ভোররাতে। সব সেবা সুষ্ঠুভাবে সরবরাহে বিভিন্ন সেলুনে।নিয়মিত কর্মীর পাশাপাশি রমজানের ১০-১৫ দিন থেকে অতিরিক্ত সাময়িক কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় তিন-চার গুণ বেড়েছে। দেড়-দুই ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে এসব সেলুনে সেবা নিতে হচ্ছে কাষ্টমারদের। সেবাগ্রহীতারা চুল কাটাতে এবং মুখের সৌন্দর্য বৃদ্ধিজনিত সেবাসহ বিভিন্ন ধরনের ফেসিয়াল, হাইড্রো ফেসিয়াল, চুল স্ট্রেইট ও ব্লিচ করাচ্ছেন। মেনিকিউর, পেডিকিউর করাতেও আসছে অনেকে। চুল-দাড়ি কাটাতে বিভিন্ন সেলুনে অপেক্ষা করছেন বেশ কিছু তরুণ ও যুবক। ঈদের আগে নিজেকে আরো সুন্দর আর পরিপাটি করে নিতে সেলুনগুলোতে সিরিয়াল নিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কাস্টমারের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নগরীর সেলুনের নরসুন্দরেরা। সকাল থেকে শেষরাত পর্যন্ত চলছে তাদের কর্মযজ্ঞ। দম ফালানোর ফুরসত নেই সিলেটের নরসুন্দরদের।
চুল কাটতে আসা লতিফুর রহমান উজ্জ্বল জানান, নতুন জামা-কাপড় ছাড়া যেমন ঈদ জমে না।তেমনি ঈদের আগে চুল না কাটালে মনে হয় আমেজটা পূর্ণতা পেল না। ঈদের সময় তারা বাড়তি টাকা চাচ্ছে না। তবে নাপিতদের বাড়তি আবদার থাকে বকশিসের। অনেক সময় আমরা খুশি হয়ে সেটা দিয়ে আসি।
নগরীর বেসরকারি এক চাকুরিজীবী আহমেদ রুমান বলেন, ‘প্রত্যেক ঈদের অন্তত তিন থেকে চারদিন আগে চুল কাটাই। ঈদে অনেক আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। তাদের সামনে নিজেকে একটু পরিপাটি, সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে এই চুল কাটা হয়।
আফজাল হোসেন জানান, ‘আমাদের ধর্মেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঈদের নামাজ পড়ার আগে চুল, দাড়ি ছোট করে কামানো। আর রোজার সময় এমনিতেই চুল কাটা হয় না, ফলে রোজার শেষের দিকে চুল বড় হয়ে যায়। এছাড়া চুল, দাড়ি এখন স্টাইলেরও একটা অংশ হয়ে গেছে।’
এবার চুল রঙ করানো আর ফেসিয়ালের চাহিদা বেশি জানিয়ে আসনাত উদ্দিন জেহিন বলেন, ‘ঈদের মধ্যে সবাই আলাদা বাজেট রাখে রূপচর্চার জন্য। যে পোশাকের জন্য অনেক টাকা ইনভেস্ট করেছে, কিন্তু নিজের আসল ‘অ্যাসেট’ হল চুল। সেটা যদি ঠিক না হয়, তাহলে কিন্তু ড্রেসের ইনভেস্টটা কাজে আসবে না।’
নগরীর মিরাবাজার পারফেক্ট কাট সেলুনে গোলাপগঞ্জ থেকে চুল কাটাতে আসেন আফিফ। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৯ বছর থেকে আমি এই সেলুনের নিয়মিত কাষ্টমার। এই সেলুনের সকলের কাজ অত্যান্ত দক্ষ ও নিখুত এবং তাদের ব্যবহার খুব অমায়িক তাই আমি বারবার এখানে চুল-শেভ করতে আসি। এখানে অনিক নামের এক কারিগর অত্যান্ত দক্ষতার সাথে তার হাতের যাদুতে নিখুঁতভাবে চুল কাটেন। আমি এখানে দীর্ঘদিন থেকে অনিকের কাছে চুল কাটাই এবং তৃপ্তি পাই।
সালমান নামের এক কাষ্টমার বলেন, ‘বছরের বড় উৎসবগুলোর একটি হলো ঈদ। এদিন নিজেকে পরিপাটি দেখাতে, নিজেকে আরো যাতে সুন্দর দেখায়, লুকটা যেন ভালো আসে, এজন্যই আসা। প্রতি বছরই ঈদের আগে চুল কাটাটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’
১৪ বছর ধরে এ সেলুনে এক কারিগরের কাছে চুল কাটান ব্যবসায়ী ইব্রাহিম মিয়া। এবার ঈদের আগেও এসেছেন চুল কাটাতে। তার সাথে কথা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘কারিগর রতন দেব যখন সিলেটে আসেন কাজ শুরু করেন তখন মাঝে মাঝে তার কাছে চুল কাটতাম। দীর্ঘ ১৪ বছর থেকে রতন বাবু আমার নিয়মিত চুল কাটেন। তার হাতের কাজ খুব ভালো তাই আমি এখানেই তার কাছে চুল কাটাই। অন্য কোনো কারিগর দিয়ে চুল কাটালে সেটা আমার পছন্দ হয় না। অন্য কারো কাছ থেকে চুল কাটতে অস্বস্তি লাগে! যিনি সবসময় চুল কেটে দেন, তিনিই আসলে ভালো বুঝতে পারেন কোন স্টাইলটা মানাবে।’
ঈদের আগ মুহূর্তে কেন সেলুনে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে চুল কাটলে একটু ফ্রেশ লাগে। অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে।’
নগরীর মিরাবাজারে পারফেক্ট কাট সেলুনের কর্ণধার রতন দেব জানান, দিন দিন ছেলেরাও রূপচর্চায় সচেতন হচ্ছেন। ফলে ঈদ উৎসবসহ বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে নিজেকে আরেকটু পরিপাটি করে নিতেই তারা সেলুনে ভিড় করেন। ঈদে এদিক-ওদিক ঘুরতে যাবে, সবার সঙ্গে দেখা করবে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা হবে, ছবি তোলা হবে আর এই কারণে সবাই চায় নিজেদের একটু পরিপাটি করে নিতে, আরো সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে। তাই ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব আসলে সকলের মতো সেলুনেও কর্মব্যস্ততা দ্বিগুণ হয়ে যায়।
গৌতম দেব নামের এক সেলুন মালিক জানান, বিভিন্ন উপলক্ষ আসলে সেলুনে শুরু থেকেই কাজের ব্যস্ততা শুরু যায়। স্বাভাবিক সময়ে সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সেলুন খোলা রাখলেও এখন সকাল ৯টা থেকে ভোররাত পর্যন্ত সেলুন খোলা রাখতে হচ্ছে। চুল কাটাতে সাধারণত ২শ’ টাকা লাগে। পছন্দের নকশার চুল কাটাতে ২শ’ ৫০ টাকা, দাড়ি কামাতে ১শ’ টাকা লাগে। ৬শ’ থেকে ৩ হাজার টাকায় ফেসিয়াল, আর ৪শ’ থেকে হাজার টাকায় চুলে রঙ করানো হয়। তাছাড়া যারা চুল বড় রাখেন, তারা চুল রিবন্ডিং ও স্ট্রেইট করান তাদের বেলায় টাকাটা একটু বেশি খরচ হয়।
Editor-in-Chief and Publisher: Mohammed Imran Ali, Executive Editor: Ahmed Ferdous Shakar, News Editor: Ahia Ahmed. E-mail: news.todaysylhet24@gimal.com
www.todaysylhet.com